আগামীকাল নবম পে-স্কেল নিয়ে সচিব কমিটির যে মিটিং রয়েছে সে মিটিংয়ের বিস্তারিত আলোচনা

 


আগামীকাল ২১ মে, ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের ‘সচিব পর্যালোচনা কমিটি’র যে বৈঠকটি হতে যাচ্ছে, তা নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থ মন্ত্রণালয় ও সরকারি সূত্রগুলোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নীতিগত গ্রিন সিগন্যালের পর এই বৈঠকে মূলত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

অর্থনৈতিক চাপ সামলে কীভাবে এটি কার্যকর করা হবে, তা নিয়ে এই মিটিংয়ে যে সম্ভাব্য সিদ্ধান্তগুলো চূড়ান্ত হতে পারে, তা নিচে দেওয়া হলো:

১. ৩টি ধাপে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা চূড়ান্তকরণ

অর্থনীতির ওপর যেন একবারে বিশাল চাপ না পড়ে, সেজন্য জাকির আহমেদ খান কমিশনের মূল সুপারিশগুলো হুবহু একবারে না দিয়ে ৩টি অর্থবছর জুড়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতে পারে।

  • প্রথম ধাপ (২০২৬-২৭ অর্থবছর): নতুন নির্ধারিত মূল বেতনের (Basic Pay) ৫০ শতাংশ অংশ আগামী ১ জুলাই থেকে দেওয়া শুরু হবে।

  • দ্বিতীয় ধাপ (২০২৭-২৮ অর্থবছর): মূল বেতনের বাকি ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হবে।

  • তৃতীয় ধাপ (২০২৮-২৯ অর্থবছর): বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, উৎসব ও বৈশাখী ভাতাসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক আর্থিক সুবিধা পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত হবে।

২. আগামী বাজেটে (২০২৬-২৭) বড় অঙ্কের বরাদ্দ অনুমোদন

আসন্ন বাজেটে নতুন পে-স্কেলের প্রথম ধাপের জন্য প্রায় ৩০ থেকে ৩৭ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব এই বৈঠকে চূড়ান্ত রূপ পাবে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব একবারে দিতে গেলে ৪৩ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন হতো, তবে এটি ধাপে ধাপে করার কারণে ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমছে।

৩. ১০% মহার্ঘ ভাতা সমন্বয়

বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা যে ১০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা পাচ্ছেন, তা নতুন পে-স্কেলের মূল বেতনের সাথে পুরোপুরি সমন্বয় বা অ্যাডজাস্ট করার আইনি ও আর্থিক রূপরেখা এই বৈঠকে পাস হতে পারে।

৪. ভাতা ও উচ্চপদস্থদের কিছু সুবিধায় কাটছাঁট

জাকির আহমেদ খান কমিশন অনেক সুযোগ-সুবিধা বড় পরিসরে বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেও সচিব কমিটি দেশের সার্বিক রাজস্ব পরিস্থিতি বিবেচনা করে বেশ কিছু জায়গায় কাটছাঁট করতে পারে। বিশেষ করে:

  • উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য গাড়ি সুবিধা, মালি, বাবুর্চি বা অতিরিক্ত বিশেষ ভাতার প্রস্তাবগুলো বড় আকারে না বাড়িয়ে বিদ্যমান কাঠামোর কাছাকাছি রাখা হতে পারে।

  • তবে নিম্ন গ্রেডের (১১ থেকে ২০তম গ্রেড) জন্য যাতায়াত ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে।

৫. মূল বেতন এবং পেনশনের নতুন হার অনুমোদন

বৈঠকে কমিশনের মূল সুপারিশ অনুযায়ী বেতন ও পেনশনের এই কাঠামোটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হতে পারে:

  • সর্বনিম্ন মূল বেতন (২০তম গ্রেড): ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা করা।

  • সর্বোচ্চ মূল বেতন (১ম গ্রেড): ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০ টাকা করা।

  • পেনশনভোগীদের সুবিধা: ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ১০০% এবং অন্যদের স্তরভেদে ৫৫% থেকে ৭৫% পর্যন্ত পেনশন বৃদ্ধির প্রস্তাব চূড়ান্ত করা।

সংক্ষেপে: আগামীকালের বৈঠক শেষে সচিব কমিটি নতুন পে-স্কেল আগামী ১ জুলাই, ২০২৬ থেকে কার্যকর করার জন্য তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ এবং ফ্রেমওয়ার্ক সরকারের শীর্ষ মহলে পাঠাবে, যা আসন্ন বাজেটে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।


গ্রেড নম্বরবর্তমান মূল বেতন (২০১৫ সালের স্কেল)প্রস্তাবিত নতুন মূল বেতন (২০২৬)বেতন বৃদ্ধির আনুমানিক হার
১ম গ্রেড৭৮,০০০ টাকা (নির্ধারিত)১,৬০,০০০ টাকা (নির্ধারিত)১০৫%
২য় গ্রেড৬৬,০০০ - ৭৬,৪৯০ টাকা১,৩৫,০০০ টাকা১০৪%
৩য় গ্রেড৫৬,৫০০ - ৭৪,৪০০ টাকা১,১৫,০০০ টাকা১০৩%
৪র্থ গ্রেড৫০,০০০ - ৭১,২০০ টাকা১,০২,০০০ টাকা১০৪%
৫ম গ্রেড৪৩,০০০ - ৬৯,৮৫০ টাকা৮৮,০০০ টাকা১০৪%
৬ষ্ঠ গ্রেড৩৫,৫০০ - ৬৭,০১০ টাকা৭৩,০০০ টাকা১০৫%
৭ম গ্রেড২৯,০০০ - ৬৩,৪১০ টাকা৬০,০০০ টাকা১০৭%
৮ম গ্রেড২৩,০০০ - ৫৫,৪৭০ টাকা৪৮,০০০ টাকা১০৮%
৯ম গ্রেড২২,০০০ - ৫৩,০৬০ টাকা৪৬,০০০ টাকা১০৯%
১০ম গ্রেড১৬,০০০ - ৩৮,৬৪০ টাকা৩৪,০০০ টাকা১১২%
১১তম গ্রেড১২,৫০০ - ৩০,২৩০ টাকা২৭,০০০ টাকা১১৬%
১২তম গ্রেড১১,৩০০ - ২৭,৩০০ টাকা২৫,০০০ টাকা১২১%
১৩তম গ্রেড১১,০০০ - ২৬,৫৯০ টাকা২৪,৫০০ টাকা১২২%
১৪তম গ্রেড১০,২০০ - ২৪,৬৮০ টাকা২৩,০০০ টাকা১২৫%
১৫তম গ্রেড৯,৭০০ - ২৩,৪৯০ টাকা২২,০০০ টাকা১২৬%
১৬তম গ্রেড৯,৩০০ - ২২,৪৯০ টাকা২১,৫০০ টাকা১৩১%
১৭তম গ্রেড৯,০০০ - ২১,৮০০ টাকা২১,০০০ টাকা১৩৩%
১৮তম গ্রেড৮,৮০০ - ২১,৩১০ টাকা২০,৭০০ টাকা১৩৫%
১৯তম গ্রেড৮,৫০০ - ২০,৫৭০ টাকা২০,৩০০ টাকা১৩৮%
২০তম গ্রেড৮,২৫০ - ২০,০১০ টাকা২০,০০০ টাকা১৪২%

তালিকার গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক:

  • নিম্ন গ্রেডগুলোতে বেশি নজর: ২০১৫ সালের পে-স্কেলের তুলনায় এবার ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ প্রায় ১৪২% বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা মূল্যস্ফীতির বাজারে টিকে থাকতে পারেন।

  • সিনিয়র সচিব ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবদের বেতন: ১ম গ্রেডের ওপরে থাকা সিনিয়র সচিব এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব/প্রধান সচিবদের জন্য বিশেষ স্কেল হিসেবে যথাক্রমে ১,৭৫,০০০ টাকা এবং ১,৯০,০০০ টাকা (নির্ধারিত) মূল বেতনের সুপারিশ করা হয়েছে।

  • ধাপে ধাপে প্রাপ্তি: আগামীকাল সচিব কমিটির বৈঠকে এই বেতন কাঠামো অনুমোদন পেলেও, আগামী ১ জুলাই থেকে কর্মচারীরা এই নতুন স্কেলের ৫০ শতাংশ হারে মূল বেতন পাওয়া শুরু করবেন এবং পরবর্তী অর্থবছরগুলোতে বাকিটা যোগ হবে।

 

Previous Post
Next Post
Related Posts