সরকারি জমি (খাস জমি) লিজ বা ইজারা নেওয়ার প্রক্রিয়াটি (নিয়ম)

 


সরকারি জমি (খাস জমি) লিজ বা ইজারা নেওয়ার প্রক্রিয়াটি (নিয়ম)

বাংলাদেশে সরকারি জমি (খাস জমি) লিজ বা ইজারা নেওয়ার প্রক্রিয়াটি মূলত নির্দিষ্ট নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। এটি সাধারণত কৃষি জমি, অকৃষি জমি এবং জলাশয়—এই তিন ক্যাটাগরিতে বিভক্ত।

নিচে সরকারি জমি লিজ নেওয়ার সাধারণ ধাপগুলো আলোচনা করা হলো:


১. জমির ধরন নির্বাচন

প্রথমে আপনাকে নিশ্চিত হতে হবে আপনি কোন ধরনের জমি লিজ নিতে চান:

  • কৃষি জমি: ভূমিহীন কৃষক বা কৃষি কাজের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়।

  • অকৃষি জমি: শিল্পকারখানা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে লিজ দেওয়া হয়।

  • জলাশয়: মৎস্য চাষের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদে ইজারা দেওয়া হয়।

২. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

আবেদন করার জন্য সাধারণত নিচের কাগজগুলো প্রয়োজন হয়:

  • আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ও পাসপোর্ট সাইজের ছবি।

  • নাগরিকত্ব সনদ।

  • জমিটি কেন লিজ নিতে চান তার একটি লিখিত প্রস্তাবনা বা প্রকল্প পরিকল্পনা (বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে)।

  • ভূমিহীন হলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্র।

৩. আবেদন প্রক্রিয়া

সরকারি জমি লিজ নেওয়ার জন্য আপনাকে নির্দিষ্ট ভূমি অফিসে আবেদন করতে হবে:

  • উপজেলা ভূমি অফিস: সংশ্লিষ্ট উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড (AC Land) বরাবর নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হয়।

  • জেলা প্রশাসন: বড় কোনো বাণিজ্যিক বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য লিজ নিতে হলে সরাসরি জেলা প্রশাসক (DC) বরাবর আবেদন করার প্রয়োজন হতে পারে।

৪. তদন্ত ও যাচাই-বাছাই

আবেদন জমা দেওয়ার পর তহশিলদার বা ভূমি কর্মকর্তা জমিটি পরিদর্শন করবেন এবং একটি তদন্ত প্রতিবেদন এসি ল্যান্ডের কাছে জমা দেবেন। এই প্রতিবেদনে দেখা হয়:

  • জমিটি সত্যিই খাস কি না।

  • জমিটি লিজ দিলে সরকারের কোনো স্বার্থহানি হবে কি না।

  • আবেদনকারী শর্ত অনুযায়ী লিজ পাওয়ার যোগ্য কি না।

৫. অনুমোদন ও চুক্তি

তদন্ত প্রতিবেদন ইতিবাচক হলে ফাইলটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বা ভূমি মন্ত্রণালয়ে (জমির পরিমাণ ও গুরুত্ব ভেদে) পাঠানো হয়। চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পর:

  • নির্ধারিত সেলামি বা ইজারা মূল্য সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়।

  • সরকারের সাথে আবেদনকারীর একটি চুক্তিপত্র বা 'কবুলিয়ত' সম্পাদিত হয়।

  • এরপর দখল হস্তান্তর করা হয়।


গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য:

  • মেয়াদ: কৃষি জমি সাধারণত ১ বছরের জন্য নবায়নযোগ্য ভিত্তিতে দেওয়া হয়। তবে অকৃষি জমি বা শিল্প প্লটের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী (যেমন ৩০ বছর) লিজ হতে পারে।

  • ভূমিহীন অগ্রাধিকার: কৃষি খাস জমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকার ভূমিহীন পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়।

  • ডিজিটাল সেবা: বর্তমানে অনেক জেলা ও উপজেলায় অনলাইনে ভূমি সেবা পাওয়া যাচ্ছে। আপনি সংশ্লিষ্ট জেলার land.gov.bd পোর্টালে গিয়ে বিস্তারিত খোঁজ নিতে পারেন।

  • সরকারি জমি লিজ নেওয়ার ফি নির্দিষ্ট কোনো অংকের টাকা নয়; এটি মূলত জমির ধরন (কৃষি বা অকৃষি), জমির অবস্থান এবং তার বর্তমান বাজার মূল্যের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। ২০২৬ সালের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী সরকারি জমি লিজের খরচের হিসাব নিচে দেওয়া হলো:

    ১. অকৃষি খাস জমি লিজের ক্ষেত্রে (সেলামি)

    অকৃষি জমি (যেমন—দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা বসতবাড়ির জন্য) লিজ নিতে হলে নির্দিষ্ট হারে 'সেলামি' দিতে হয়। এটি ওই মৌজার গত ১২ মাসের গড় বাজার মূল্যের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়:

    • সিটি কর্পোরেশন এলাকা: গড় বাজার মূল্যের ৩ গুণ

    • পৌরসভা এলাকা: গড় বাজার মূল্যের ২ গুণ

    • অন্যান্য এলাকা: গড় বাজার মূল্যের ১.৫ গুণ

    ২. কৃষি খাস জমি লিজের ক্ষেত্রে

    কৃষি জমি সাধারণত ভূমিহীনদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে খরচ তুলনামূলক অনেক কম এবং নামমাত্র সেলামি বা ফি ধার্য করা হতে পারে। তবে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে (যেমন—মৎস্য খামার বা হাঁস-মুরগির খামার) লিজ নিলে প্রতি শতাংশে বার্ষিক হারে লিজ মানি দিতে হয়।

    ৩. অন্যান্য আনুষঙ্গিক ফি (২০২৬ সালের রেট)

    লিজ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কিছু সরকারি ফি প্রদান করতে হয়:

    • আবেদন ফি/কোর্ট ফি: ২০ টাকা।

    • নামজারি (Mutation) ফি: ১১৭০ টাকা (এর মধ্যে রয়েছে: কোর্ট ফি ২০ টাকা, নোটিশ জারি ৫০ টাকা, রেকর্ড সংশোধন ১০০০ টাকা এবং খতিয়ান ফি ১০০ টাকা)।

    • খতিয়ানের অনলাইন কপি: ১২০ টাকা।

    • মৌজা ম্যাপ: ৫৪৫ টাকা (প্রতি শিট)।


    গুরুত্বপূর্ণ নোট:

    • অনলাইন পেমেন্ট: বর্তমানে লিজ মানি বা ভূমি উন্নয়ন করের যাবতীয় লেনদেন অনলাইনে (ldtax.gov.bd) সম্পন্ন করতে হয়। কোনো নগদ অর্থ লেনদেন করবেন না।

    • আবেদন প্রক্রিয়া: ইউনিয়ন বা উপজেলা ভূমি অফিসে গিয়ে নির্দিষ্ট ফর্মে আবেদন করতে হয়। আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে জেলা প্রশাসক (DC) বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ লিজের অনুমোদন দেন।

    • প্রতারণা থেকে সাবধান: সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে কেউ অতিরিক্ত টাকা দাবি করলে সরাসরি ১৬১২২ নম্বরে কল করে অভিযোগ জানাতে পারেন।

    আপনি কি নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্যে (যেমন—ব্যবসা বা চাষাবাদ) জমি লিজ নেওয়ার কথা ভাবছেন? জানালে আমি আপনাকে আরও সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারব।

পরামর্শ: জমি লিজ নেওয়ার আগে অবশ্যই স্থানীয় ইউনিয়ন বা উপজেলা ভূমি অফিসে গিয়ে উক্ত জমিটি বর্তমানে কারও দখলে আছে কি না বা কোনো আইনি জটিলতা আছে কি না, তা যাচাই করে নিন।

Previous Post
Next Post
Related Posts